
(তথ্য ও ছবি সংগৃহীত)
সিলেটে এক অনুষ্ঠানে বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমকে সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছিলো। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে বলা হলো, এখন বাউল শাহ আবদুল করিমের হাতে সোয়া ৩ লাখ টাকার চেক তুলে দেয়া হবে।
অন্যপাশে আবদুল করিম বসা। ঘোষণা শুনতেই তিনি তার পাশে থাকা ছেলে শাহ নূর জালাল বাবুলকে বললেন ‘সোয়া ৩ হাজার টাকা! এতো টাকা দিয়া আমি কি করমু? এতো টাকা আমার লাগবে না।’
পাশ থেকে বলা হলো সোয়া ৩ হাজার টাকা না, সোয়া ৩ লাখ টাকা।
শাহ আবদুল করিম এবার টাকার অংক শুনে উঠে বলেই ফেললেন, “এতো টাকা দিয়া আমার কাজ কী? মানুষ আমারে ভালোবাসে এটাই বড়। এই টাকা আমার লাগবো না। এই বাবুল চল, বাড়িত যাই।”
.
আরেকবার দোহারের শিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য শাহ আব্দুল করিমকে জিজ্ঞেসা করেছিলেন-
‘মানুষ আপনার গান বিকৃত সুরে গায়। আপনার সুর ছাড়া অন্য সুরে গায়। অনেকে আপনার নামটা পর্যন্ত বলে না। এসব দেখতে আপনার খারাপ লাগে না?’
শাহ্ আবদুল করিম জবাবে বললেন-
‘কথা বোঝা গেলেই হইল
আমার আর কিচ্ছু দরকার নাই’
কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য ভীষণ অবাক হলেন। তিনি বিস্ময়ের গলায় বললেন, ‘আপনার সৃষ্টি, আপনার গান। মানুষ আপনার সামনে বিকৃত করে গাইবে। আপনি কিছুই মনে করবেন না… এটা কোন কথা… এটার কোন অর্থ আছে?’
শাহ আবদুল করিম বললেন- ‘তুমি তো গান গাও,
আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো। ধরো তোমাকে একটা অনুষ্ঠানে ডাকা হলো। হাজার হাজার চেয়ার রাখা আছে কিন্তু গান শুনতে কোন মানুষ আসে নাই। শুধু সামনের সারিতে একটা মানুষ বসে আছে।
গাইতে পারবে?’
কালীপ্রসাদ কিছুক্ষন ভেবে উত্তর দিলেন- ‘না সে আমি পারবো না।’
.
শাহ আবদুল করীম হেসে বললেন ‘আমি পারবো,
কারণ আমার গানটার ভেতর দিয়ে আমি একটা আদর্শকে প্রচার করতে চাই। সেটা একজন মানুষের কাছে হলেও। সুর না থাকুক, নাম না থাকুক। কিন্তু সেই আদর্শটা থাকলেই হলো। আর কিছু দরকার নাই… সেজন্যই বললাম শুধু গানের কথা বোঝা গেলেই আমি খুশি!’
কালীপ্রসাদ ভট্টাচার্য আশ্চর্যের গলায় বললেন, ‘সেই আদর্শটা কি?’
‘একদিন এই পৃথিবীটা বাউলের পৃথিবী হবে,
এই পৃথিবী একদিন বাউলের পৃথিবী হয়ে যাবে।’ আবেগের গলায় বললেন আবদুল করিম।
.
এতো বিখ্যাত মানুষ হওয়া সত্ত্বেও কোন মাপের নির্লোভ মানুষ হলে তাঁর পক্ষে এটা বলা সম্ভব ছিলো তাই ভাবছি!
.
ছিলেন কৃষকের সন্তান, মাঠে ঘাটে রাখাল হিসেব গরু চরাতেন, সেই রাখাল বালক থেকে হয়ে উঠলেন বাউল সম্রাট। অথচ এতো খ্যাতির পর ও আজীবন ছিলেন মাটির মানুষ হয়ে। তাঁর আন্তরিকতা ছিলো দেখার মতো। এমন ও হয়েছে তাঁর ঘরে খাবার নেই, কিন্তু দূর দূরান্ত থেকে আসা মেহমান। নিজে না খেয়ে অতিথি অ্যাপায়ন করতেন। বাংলার বাউল সঙ্গীতকে এক অনন্য উচ্চাতায় নিয়ে গেছেন তিনি।
.
ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলেছে বারবার সকল অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরূদ্ধে। আবদুল করিম গানের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন প্রখ্যাত বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ এবং দুদ্দু শাহ এর দর্শন থেকে। বাউলগানের দীক্ষা নিয়েছিলেন সাধক রশীদ উদ্দীন, শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বকশ এর কাছ থেকে।
.
কেবল বাউল গান না; শরীয়তী, মারফতি, দেহতত্ত্ব, গণসংগীতসহ সংগীতের বহুরূপে সৃষ্টি ছিলো তাঁর।
তাঁর ৫০০ র বেশী রচিত গানের সম্ভারে ২০টির মতো গান ইংরেজিতে অনূদিতও হয়েছে।
কার্টেসি: আহমাদ ইশতিয়াক/ বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র





