নিতাই ভট্টাচার্য্য :
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে ‘ঝাড়ুদার’ পদে কর্মরত শহিদুল আলম ফরহাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অনিয়মিত থাকা, সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলন, ভূমি সংক্রান্ত কাজে দালালি ও ঘুষ গ্রহণ এবং সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথি অননুমোদিতভাবে সরবরাহের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে তিনি পটিয়া সদর ভূমি অফিসে ‘রেকর্ডকিপার’ হিসেবে কাজ করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নথিপত্র সংরক্ষণের দায়িত্বের সুযোগ নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভূমি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় নথি বিভিন্ন ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি একজনের খতিয়ান অন্য ব্যক্তির হাতে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে বাঁশখালী ভূমি অফিসের নাজির ওয়াহিদুল্লাহ সিকদার ‘নাটের গুরু’ হিসেবে কাজ করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে দুদক চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন পটিয়ার বাসিন্দা মো. মিন্টু আলম। অভিযোগে সরকারি অর্থের অপব্যবহার, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, ভূমি অফিসের নথি অননুমোদিতভাবে সরবরাহ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়গুলো তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, শহিদুল আলম ফরহাদ ২০১২ সালে ধলঘাট ইউনিয়ন তহসিল অফিসে ঝাড়ুদার হিসেবে নিয়োগ পান। অভিযোগকারীর দাবি, এরপর দীর্ঘ সময় তিনি কর্মস্থলে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেননি। কিন্তু সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন।
অভিযোগকারীর দাবি, পরবর্তীতে ফরহাদ পটিয়া সদর ভূমি অফিসে রেকর্ডকিপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দায়িত্বের সুযোগ নিয়ে ভূমি অফিসের রেকর্ড, খতিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিতে তার প্রবেশাধিকার তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সরকারি নথি ও খতিয়ানের তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নামজারি, বন্দোবস্ত, ভিপি সম্পত্তি ও ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে ফরহাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব কাজে সাধারণ মানুষকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
টাকা ছাড়া কাজ হয় না
দুদকে দেওয়া অভিযোগে মো. মিন্টু আলম দাবি করেন, তার বন্দোবস্তি-সংক্রান্ত একটি ফাইলের (স্মারক নং-৫৪১, ডকেট নং-৩০৬) বিষয়ে গত ৩ মার্চ পটিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করলে তাকে ফরহাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। পরে ফরহাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কাজটি করে দেওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগকারীর দাবি। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ‘টাকা ছাড়া এখানে কোনো কাজ হয় না’—এমন কথা বলা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ফাইলের পেছনে ঘোরার পর গত ৩১ আগস্ট তিনি জানতে পারেন, বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফরহাদকে অফিস থেকে বের করে দিয়েছেন।
নেপথ্যে নাজির ওয়াহিদুল্লাহ
অভিযোগপত্রে পটিয়া ও বাঁশখালী ভূমি অফিসের নাজির হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ওয়াহিদুল্লাহ সিকদারের বিরুদ্ধে ফরহাদকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব ও প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। ভূমি অফিসের বিভিন্ন অনিয়মে ফরহাদ একা নন, তার পেছনে প্রভাবশালী একটি চক্র রয়েছে। আর ওই চক্রের অন্যতম ব্যক্তি হিসেবে ওয়াহিদুল্লাহ সিকদারের নাম অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে ফরহাদের বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়েছে। তার নামে ও বেনামে জমি, বাড়ি, গাড়ি এবং অন্যান্য সম্পদের তথ্য তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ফরহাদ ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব তলব করে সম্পদের উৎস যাচাইয়ের আবেদন করা হয়েছে। অভিযোগে কয়েকটি জমি কেনার তথ্যও দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি দলিলের মাধ্যমে ০.৬২২২ একর জমি ৫৪ লাখ ৯০ হাজার টাকায় কেনার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
অভিযোগকারীর দাবি, ভূমি অফিসের মতো স্পর্শকাতর সরকারি দপ্তরে দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কোনো কর্মচারীর রেকর্ড ও গোপন নথিতে প্রবেশাধিকার এবং অর্থের বিনিময়ে নথি সরবরাহের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এর ফলে সাধারণ মানুষের জমিজমা ও মালিকানাসংক্রান্ত তথ্যের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এ কারণে ফরহাদের নিয়োগপত্র, পদায়ন, কর্মস্থলে উপস্থিতির রেকর্ড, বেতন-ভাতা উত্তোলনের তথ্য, বর্তমানে তিনি কোন পদে ও কী দায়িত্বে কর্মরত—এসব নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে ভূমি অফিসের রেকর্ডরুমে তার প্রবেশাধিকার, নথি ব্যবস্থাপনা এবং খতিয়ান সরবরাহের অভিযোগ তদন্তেরও দাবি করা হয়েছে।
দুদকের কাছে অভিযোগকারী সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, দলিলপত্র ও আয়কর নথি যাচাই করে সম্পদের বৈধ উৎস অনুসন্ধানের আবেদন জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে শহিদুল আলম ফরহাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি। এদিকে ওয়াহিদুল্লাহ সিকদারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র, কর্মস্থলে উপস্থিতির রেকর্ড, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত তথ্য এবং ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো তদন্তের পরই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে জানান অভিযোগকারী।
এবিষয়ে জানার জন্য পটিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি)
আবদুল্লাহ-আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।